ক্যান্সারের কোনো উত্তর জানা নেই, সেটা সবাই জানেন। কিন্তু ফুসফুসের ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য। এটা বলার উদ্দেশ্য হলো-এই রোগের কারণ জানা গেছে। সেটা হলো ধুমপান। ধুমপান পরিহার করলে ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
ফুসফুসের ক্যান্সার সত্যিই একটি বিপর্যয়কর এবং ঘাতক বক্ষব্যাধি। উন্নত দেশগুলোতে ক্যাসারজনিত কারণে মৃত্যুর মাঝে ফুসফুসের ক্যান্সার উল্লেখযোগ্য স্হান দখল করে আছে। প্রতি বছরই এর সংখ্যা বাড়ছে। এই রোগ চল্লিশ বছরের নিচে সাধারণত হয় না। তবে পুরুষের ক্ষেত্রে সত্তর ঊর্ধ্ব বয়সীদের বেশি হতে দেখা যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আজকাল মহিলাদের মধ্যে এই রোগ বেশ দেখা যায়। যে যত বেশি মাত্রায় এবং বেশি দিন ধরে ধুমপান করবেন তার এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকাও তত বেশি হবে। ধুমপানের মাঝেও আবার কিছু ব্যাপার রয়েছে, যা এই রোগের আশংকাকে বাড়িয়ে দেয়-যেমন সিগারেটের ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে নেয়া, একটি সিগারেটকে বারবার টানতে থাকা, জ্বলন্ত সিগারেটটি হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে না রেখে ঠোঁটের মধ্যে রেখে নিঃশ্বাস গ্রহণ করা, নেভানো সিগারেট পুনরায় জ্বালিয়ে খাওয়া এবং সিগারেট খেতে খেতে একেবারে শেষ পর্যন্ত টেনে খাওয়া ইত্যাদি।
শহরের বিষাক্ত ধোঁয়া ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সারা জীবন ধুমপান না করলেও ক্যান্সার হতে পারে। আর তা হতে পারে গাড়ির কালো ধোঁয়া বা মিল-কারখানার কালো ধোঁয়া সবসময় নাকে ঢুকতে থাকলে।
ফুসফুসের ক্যাসারের কিছু লক্ষণ আছে। যদিও সব লক্ষণ খুব একটা সুনির্দিষ্ট নয়। প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই কফ ও কাশি থাকে এবং শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে কাশির সঙ্গে অল্প অল্প কফ যায়। ফুসফুসের ক্যাসারে যক্ষ্মার মতো হঠাৎ করে গল গল করে রক্ত যায় না। যে ব্যক্তি গত ২০ বছর বা তার অধিক সময় ধরে ধুমপান করছেন তার কাশির সঙ্গে যদি একবারও রক্ত গিয়ে থাকে তবে অবশ্যই সেটা সন্দেহের উদ্রেক করে। আর সন্দেহ দেখা দিলেই চিকিৎসক তখন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে তৎপর হবেন। শতরা ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অবশ্য শ্বাসকষ্ট নির্ভর করে ক্যাসারের আকার এবং ফুসফুসে তার অবস্হানের ওপর। শতকরা ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা দেখা দেয়। বুকে ব্যথা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এত তীব্র আকার ধারণ করে যে, চিকিৎসক কোনো ব্যথা নিরোধক ওষুধ ব্যবহার করলেও সে ব্যথা আয়ত্তে আনতে পারেন না।
এই ক’টি সাধারণ লক্ষণ ছাড়াও ক্যান্সার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন জাতীয় লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। বাংলাদেশে আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে ধুমপায়ীর সংখ্যা। প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সিগারেট এবং বিড়ি। প্রতিদিন অন্তত ১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে শুধু ধুমপানের জন্য। বিরাট অংকের এ অর্থ সম্পুর্ণই মানব দেহে কুফল বয়ে আনে। এই ধুমপায়ী মানুষগুলো আক্রান্ত হচ্ছে ক্যাসারসহ বিভিন্ন জটিল বক্ষব্যাধিতে। এসব রোগে প্রতি ১৩ সেকেন্ডে ১ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটছে। বিশ্বস্বাস্হ্য সংস্হার এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে পুরুষ ধুমপায়ীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি এবং মহিলা ধুমপায়ীর সংখ্যা অন্তত ৬০ লাখ। এ সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে একটা চিন্তার কারণ। মনে রাখতে হবে যারা ধুমপান করেন, তাদের আশপাশে যারা থাকেন, তারাও ধোঁয়ায় আক্রান্ত হন সমানভাবে। এই হিসেবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধুমপানের কারণে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যা অন্তত ৭ কোটি মানুষ। একবার এই ঘাতক ব্যাধি দেখা দিলে চিকিৎসা ধীরে ধীরে দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। কারণ সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে যে সময়ের প্রয়োজন পড়ে সে সময়ের মাঝে ক্যান্সার কোষগুলো ছড়িয়ে পড়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে। তাই এই প্রতিরোধযোগ্য ঘাতক ব্যাধি সম্পর্কে আজই সতর্ক এবং সচেতন হোন। ধুমপান বর্জন করুন।
ক্যান্সার এবং যক্ষ্মার একটি লক্ষণ স্বরভঙ্গ
স্বরভঙ্গ বলতে আমরা গলার শব্দ বা আওয়াজ বসে যাওয়াকেই বুঝে থাকি। এতে কখনো রোগী ফিসফিস করে কথা বলে আবার কখনো এত আস্তে শব্দ করে যে, কিছুই শুনতে পাওয়া যায় না। বস্তুতপক্ষে স্বরভঙ্গ বা গলা বসে যাওয়াটা নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসার আওতাধীন বিষয়। কারণ শব্দনালী বা ল্যারিংসে স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দেখা দিলেই স্বর ভেঙে যায় এবং রোগীও ইএনটি বিশেষজ্ঞের কাছে যান পরামর্শের জন্য। ক্যানভাসার বা রাজনৈতিক নেতা যারা উচ্চস্বরে বক্তৃতা করেন, তাদেরও প্রায়ই গলা বসে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্বরভঙ্গের পেছনে ফুসফুসের ব্যাপক যক্ষ্মা এবং ক্যাসারের কারণে হয়ে থাকে।
**************************
আমার দেশ, ১৮ নভেম্বর ২০০৮।